Dr Bappaditya Har

বাংলায় রোগী-নির্দেশিকা

কলকাতায় লিভার ট্রান্সপ্লান্ট: পরিবারের জন্য সহজ বাংলায় পুরো তথ্য

লিভার পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিলে ওষুধে আর সারে না — তখন লিভার ট্রান্সপ্লান্টই একমাত্র চিকিৎসা হতে পারে। এই পাতায় পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও আশেপাশের রাজ্যের বাংলাভাষী পরিবারের জন্য সহজ ভাষায় বোঝানো হয়েছে: কখন ট্রান্সপ্লান্ট লাগে, ডোনার কে হতে পারেন, আইন কী বলে, আর অপারেশনের পর জীবন কেমন হয়। ডা. বাপ্পাদিত্য হার কলকাতার মুকুন্দপুরে নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ও HPB সার্জন হিসেবে কাজ করেন।

By Dr Bappaditya Har, Liver Transplant & HPB Surgeon, Narayana RN Tagore Hospital, Mukundapur · Updated 24 September 2026

মূল কথা

  • সিরোসিস বা লিভার ফেলিওর যখন ওষুধে নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে ভাবার সময়। যত আগে মূল্যায়ন হয়, তত ভালো।
  • ভারতে বেশিরভাগ ট্রান্সপ্লান্ট হয় জীবিত দাতার লিভারের একটা অংশ দিয়ে। দাতার লিভার কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে আবার অনেকটাই বেড়ে ওঠে।
  • ডোনার সাধারণত নিকট আত্মীয় হন; আইন (THOTA) অনুযায়ী হাসপাতালের অনুমোদন কমিটি সব কাগজপত্র ও সম্মতি যাচাই করে।
  • অপারেশনের পর সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়, আর প্রথম দুই-তিন মাস কলকাতার কাছাকাছি থাকা দরকার।
  • রিপোর্ট আগে থেকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে পারেন: +91 70420 39420। অ্যাপয়েন্টমেন্ট: 080675 06860।

কখন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট লাগে?

লিভার শরীরের অনেক জরুরি কাজ করে — রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান তৈরি, বিষাক্ত জিনিস পরিষ্কার করা, হজমের জন্য পিত্তরস বানানো। লিভার দীর্ঘদিন ধরে খারাপ হতে থাকলে (সিরোসিস) বা হঠাৎ করে বিকল হয়ে গেলে এই কাজগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তখন নতুন লিভার বসানোই — অর্থাৎ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট — প্রাণ বাঁচানোর চিকিৎসা হয়ে দাঁড়ায়।

  • ডিকম্পেনসেটেড সিরোসিস — বারবার পেটে জল জমা (অ্যাসাইটিস), রক্তবমি, জন্ডিস বা ঘুম-ঘুম ভাব ও ভুল বকা (হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি)। কারণ হতে পারে মদ, হেপাটাইটিস বি বা সি, ফ্যাটি লিভার, অটোইমিউন বা জিনগত রোগ।
  • অ্যাকিউট লিভার ফেলিওর — আগে সুস্থ মানুষের লিভার কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে বিকল হয়ে যাওয়া। এটা জরুরি অবস্থা; বিস্তারিত দেখুন অ্যাকিউট লিভার ফেলিওর পাতায়।
  • লিভার ক্যানসার (HCC) — সিরোসিসের সঙ্গে টিউমার, যদি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে।
  • শিশুদের লিভারের রোগ — যেমন বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া বা কিছু জন্মগত মেটাবলিক রোগ।

রোগ কতটা গুরুতর, তা মাপার জন্য ডাক্তাররা রক্তপরীক্ষা থেকে MELD স্কোর (শিশুদের ক্ষেত্রে PELD) হিসেব করেন। স্কোর যত বেশি, বিপদ তত বেশি। তবে শুধু স্কোর দেখে নয়, রোগীর সার্বিক অবস্থা দেখে ট্রান্সপ্লান্ট টিম সিদ্ধান্ত নেয়।

জীবিত দাতা আর মৃত দাতা — পার্থক্য কী?

জীবিত দাতা (লিভিং ডোনার)মৃত দাতা (ক্যাডাভার / ডিসিসড ডোনার)
লিভার কোথা থেকে আসেসুস্থ আত্মীয়ের লিভারের একটা অংশব্রেন ডেথ ঘোষিত মানুষের পরিবার অঙ্গদানে রাজি হলে, পুরো লিভার
সময়পরিকল্পনা করে, রোগী আরও খারাপ হওয়ার আগে করা যায়লিভার কবে পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়; রাজ্যের অঙ্গ-বণ্টন তালিকায় নাম লেখাতে হয়
দাতার ঝুঁকিএকজন সুস্থ মানুষের বড় অপারেশন — ঝুঁকি কম হলেও শূন্য নয়কোনো জীবিত মানুষের অপারেশন হয় না
কোথায় বেশি হয়ভারতে বেশিরভাগ ট্রান্সপ্লান্টঅঙ্গদান বাড়লে সংখ্যা বাড়ছে

অভিজ্ঞ কেন্দ্রে দুই ধরনের ট্রান্সপ্লান্টেরই দীর্ঘমেয়াদি ফল মোটামুটি কাছাকাছি। বিস্তারিত জানতে পড়ুন জীবিত দাতার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট এবং মৃত দাতার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট (ইংরেজিতে)। রক্তের গ্রুপ না মিললেও কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভব।

লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ডোনার কে হতে পারেন? আইনি প্রক্রিয়া

  • সাধারণত বয়স ১৮ থেকে মোটামুটি ৫৫ বছরের মধ্যে, শারীরিকভাবে সুস্থ, আর নিজের ইচ্ছায় — কোনো চাপ বা টাকার লেনদেন ছাড়া — দান করতে রাজি।
  • রক্তের গ্রুপ মানানসই হতে হয় (বা বিশেষ প্রস্তুতি লাগে), লিভারের আকার যথেষ্ট হতে হয়, আর বেশি ফ্যাটি লিভার থাকলে চলবে না।
  • মদ্যপান, বড় কোনো হার্ট বা কিডনির রোগ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা বেশি ওজন থাকলে সাধারণত ডোনার হওয়া যায় না।

ভারতে অঙ্গদান চলে মানব অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন আইন (THOTA, ১৯৯৪; ২০১১ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, দাদু-দিদা ও নাতি-নাতনি হলেন 'নিকট আত্মীয়'। অন্য আত্মীয় বা বন্ধু দাতা হতে চাইলে হাসপাতাল বা রাজ্যের অনুমোদন কমিটির (অথরাইজেশন কমিটি) সামনে প্রমাণ দিতে হয় যে দানটা ভালোবাসা বা স্নেহ থেকে, কোনো লেনদেন থেকে নয়। বিদেশি রোগীর (যেমন বাংলাদেশ থেকে) ক্ষেত্রে দূতাবাসের প্রত্যয়নপত্রসহ অতিরিক্ত কাগজ লাগে।

পরিচয়পত্র, সম্পর্কের প্রমাণ, ছবি, সম্মতিপত্র — সবকিছু ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটর বুঝিয়ে দেন। পুরো যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া পড়ুন কে লিভার ডোনার হতে পারেন পাতায়।

মূল্যায়ন: অপারেশনের আগে কী কী পরীক্ষা হয়

  1. 1

    প্রথম পরামর্শ

    পুরনো সব রিপোর্ট, স্ক্যান আর ওষুধের তালিকা নিয়ে আসুন। দূর থেকে এলে আগে হোয়াটসঅ্যাপে রিপোর্ট পাঠালে বোঝা যায় কোন পরীক্ষা বাকি আছে।

  2. 2

    রোগীর মূল্যায়ন

    রক্তপরীক্ষা, CT স্ক্যান, হার্ট ও ফুসফুসের পরীক্ষা, সংক্রমণের খোঁজ, দাঁত ও পুষ্টির পরীক্ষা। হেপাটোলজিস্ট, অ্যানাস্থেটিস্ট আর অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা দেখেন রোগী অপারেশনের ধকল নিতে পারবেন কিনা।

  3. 3

    ডোনারের মূল্যায়ন

    ধাপে ধাপে রক্তপরীক্ষা, লিভারের CT/MRI দিয়ে আকার ও রক্তনালী মাপা, দরকারে লিভার বায়োপসি। ডোনারের নিরাপত্তাই এখানে প্রথম কথা।

  4. 4

    আইনি অনুমোদন

    কাগজপত্র যাচাই আর অনুমোদন কমিটির ইন্টারভিউ শেষ হলে তবেই অপারেশনের তারিখ ঠিক হয়।

এই ধাপগুলোর বিস্তারিত রয়েছে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট মূল্যায়ন পাতায়।

অপারেশন আর সুস্থ হয়ে ওঠা

জীবিত দাতার ট্রান্সপ্লান্টে একই দিনে দুটো অপারেশন হয় — দাতার লিভারের একটা অংশ বের করা আর রোগীর অসুস্থ লিভার সরিয়ে সেই অংশ বসানো। রোগীর অপারেশন অনেক ঘণ্টা ধরে চলে। অপারেশনের পর রোগী কয়েক দিন ট্রান্সপ্লান্ট ICU-তে থাকেন, তারপর ওয়ার্ডে। সব মিলিয়ে সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়; অপারেশনের আগে যিনি খুব অসুস্থ ছিলেন, তাঁর আরও বেশি সময় লাগতে পারে।

  • প্রথম কয়েক সপ্তাহ ঘনঘন রক্তপরীক্ষা হয়, তাই ছুটির পর দুই-তিন মাস হাসপাতালের কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা করুন।
  • নতুন লিভারকে শরীর যাতে প্রত্যাখ্যান (রিজেকশন) না করে, সেজন্য ট্যাক্রোলিমাসের মতো ওষুধ সারাজীবন খেতে হয়। একটা ডোজও বাদ দেবেন না।
  • ডাক্তারকে না জিজ্ঞেস করে কোনো কবিরাজি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথি বা 'লিভার টনিক' খাবেন না — এগুলো ওষুধের মাত্রা বদলে দিতে বা লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
  • মদ সারাজীবনের জন্য বন্ধ।

দাতা সাধারণত এক সপ্তাহের মতো হাসপাতালে থাকেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক কাজে ফেরেন। দাতার অপারেশন নিয়ে জানতে দেখুন লিভার ডোনার সার্জারি, আর রোগীর সুস্থ হওয়ার ধাপ নিয়ে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পর সুস্থ হওয়া (ইংরেজিতে)।

খরচ কত?

খরচ নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, ট্রান্সপ্লান্টের ধরন, ICU-তে কতদিন থাকতে হয় আর কোনো জটিলতা হয় কিনা তার ওপর। মোট খরচে থাকে মূল্যায়ন, দাতা ও রোগীর অপারেশন, হাসপাতালে থাকা আর পরের ওষুধ। বিস্তারিত ও বিমা-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য দেখুন কলকাতায় লিভার ট্রান্সপ্লান্টের খরচ পাতা, অথবা সরাসরি ফোন করে জেনে নিন।

বাংলাদেশ ও অন্য রাজ্য থেকে আসা পরিবারের জন্য

উত্তরবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, অসম ও উত্তর-পূর্বের রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকে অনেক পরিবার চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন। রওনা হওয়ার আগে রিপোর্ট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে জানা যায় ট্রান্সপ্লান্ট দরকার কিনা, দাতা কে হতে পারেন আর কোন কাগজ সঙ্গে আনতে হবে। বাংলাদেশের রোগীদের জন্য মেডিক্যাল ভিসা ও কাগজপত্রের তথ্য আছে বাংলাদেশের রোগীদের জন্য নির্দেশিকা পাতায় (ইংরেজিতে)।

কীভাবে যোগাযোগ করবেন

অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ফোন

080675 06860

হোয়াটসঅ্যাপে রিপোর্ট পাঠান

+91 70420 39420 — রোগীর নাম, বয়স, সমস্যা আর সাম্প্রতিক রিপোর্ট ও স্ক্যানের ছবি পাঠান।

কোথায় দেখাবেন

নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতাল, মুকুন্দপুর, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস, কলকাতা।

ডা. বাপ্পাদিত্য হার হেপাটোলজিস্ট, ট্রান্সপ্লান্ট অ্যানাস্থেটিস্ট, ইনটেনসিভিস্ট ও কো-অর্ডিনেটরদের নিয়ে গড়া একটি ট্রান্সপ্লান্ট টিমের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি জীবিত ও মৃত দাতার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট, শিশুদের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট এবং লিভার, পিত্তনালী ও প্যানক্রিয়াসের জটিল অপারেশন করেন। তাঁর সম্পর্কে আরও জানতে দেখুন পরিচিতি পাতা।

সাধারণ প্রশ্ন

লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কখন করতে হয়?

যখন সিরোসিস বা লিভার ফেলিওর ওষুধে আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না — যেমন বারবার পেটে জল জমা, রক্তবমি, জন্ডিস বা ভুল বকা — অথবা হঠাৎ লিভার বিকল হয়ে যায়। MELD স্কোর আর রোগীর সার্বিক অবস্থা দেখে ট্রান্সপ্লান্ট টিম সিদ্ধান্ত নেয়।

লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ডোনার কে হতে পারেন?

সাধারণত ১৮ থেকে মোটামুটি ৫৫ বছর বয়সী সুস্থ নিকট আত্মীয় — স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, দাদু-দিদা বা নাতি-নাতনি। অন্য কেউ দান করতে চাইলে অনুমোদন কমিটির অনুমতি লাগে। টাকার বিনিময়ে অঙ্গদান আইনত নিষিদ্ধ।

লিভার দান করলে কি দাতার ক্ষতি হয়?

দাতার লিভারের যে অংশ থাকে, তা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে অনেকটাই আবার বেড়ে ওঠে, আর বেশিরভাগ দাতা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন। তবে এটা বড় অপারেশন, তাই ঝুঁকি কম হলেও শূন্য নয় — অপারেশনের আগে সব ঝুঁকি দাতাকে আলাদা করে বুঝিয়ে বলা হয়।

লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পর কতদিন হাসপাতালে থাকতে হয়?

রোগী সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ, আর দাতা মোটামুটি এক সপ্তাহ। ছুটির পরেও প্রথম দুই-তিন মাস ঘনঘন পরীক্ষার জন্য কলকাতার কাছাকাছি থাকা ভালো।

লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পর কি স্বাভাবিক জীবন কাটানো যায়?

হ্যাঁ, বেশিরভাগ মানুষ কয়েক মাসের মধ্যে কাজে, পড়াশোনায় ও সংসারে ফিরে যান। তবে সারাজীবন নিয়ম করে ওষুধ খেতে, রক্তপরীক্ষা করাতে আর মদ থেকে দূরে থাকতে হয়। বিস্তারিত দেখুন লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পরের জীবন (ইংরেজিতে)।

বাংলাদেশ থেকে কীভাবে যোগাযোগ করব?

হোয়াটসঅ্যাপে +91 70420 39420 নম্বরে রোগীর রিপোর্ট পাঠান। রিপোর্ট দেখে জানানো হবে ট্রান্সপ্লান্ট দরকার কিনা এবং ভিসা ও কাগজপত্রের জন্য কী কী লাগবে।

আরও পড়ুন

This page is general patient information, not a diagnosis or a substitute for a consultation. Treatment decisions depend on each patient's reports and examination. Read our medical disclaimer and editorial policy.

ডা. বাপ্পাদিত্য হারের সঙ্গে পরামর্শ করুন

রিপোর্ট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান বা ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।

WhatsApp